রিপন বিশ্বাস, নড়াইল প্রতিনিধি
নড়াইল জেলার লােহাগড়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে - ছিটিয়ে থাকা প্রাচীন স্থাপনাগুলি অর্থাৎ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শশ্নগুলিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘােষণা করে সংরক্ষণ ও সংস্কার করা হলে পর্যটকদের কাছে হতে পারে আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র ।
একইভাবে এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শণগুলি গবেষকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে ।
লােহাগড়ার ন্যায় বাংলাদেশের আর কোন উপজেলায় এতগুলি প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থাকার নজীর নেই বললেই চলে । অথচ দুর্মূল্য এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি সংরক্ষণের কোন উদ্যেগ নেই বললেই চলে । পুরাকীর্তি হিসাবে বিবেচিত হতে পারে এমন প্রাচীন স্থাপনাগুলির অধিকাংশই সংরক্ষণের অভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে । প্রতিকূল পরিবেশ ও অসৎ লােকেদের হাত থেকে যেগুলি এখনও টিকে আছে । সেগুলিও অযত্ন - অবহেলায় ধংসস্তুপে পরিণত হয়েছে । এখনও যা টিকে আছে তা সংরক্ষণ করা হলে লােহাগড়া উপজেলা হতে পারে বাংলাদেশের সেরা প্রত্তাত্ত্বিক পর্যটন কেন্দ্র । যা পুরাকীর্তি গবেষকদের কাছে তীর্থভূমি হিসাবে বিবেচিত হতে পারে ।
পুরাকীর্তি নিয়ে গবেষণা যেমন দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি গবেষকদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে । বিশেষ করে সুলতানি বা মােগল আমলের স্থাপনা , হিন্দুমন্দির স্থাপত্য , পােড়া মাটির বিভিন্ন ফল্লক বা অলঙ্করণ নিয়ে গবেক্ষণা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে । এসব নিয়ে গবেষণায় আগ্রহীদের জন্য লােহাগড়া উপজেলার প্রাচীন স্থাপনা গবেষণার দুর্মূল্য উপাদান । গবেষকদের জন্য গবেষণার উপাদান ছাড়াও এসব ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসাবে সংরক্ষণ করে সংস্কার করা হলে দেশি বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত হতে পারে ।
লােহাগড়ার উপজেলার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলির মধ্যে এখনও যেগুলি টিকে আছে সেগুলির মধ্যে রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার বাড়ির ( বর্তমানে লােহাগড়া কলেজ প্রাঙ্গনের ) আঙ্গিনায় অবস্থিত জোড়বাংলা মন্দির , ইতনায় ঔপন্যাসিক নীহার রঞ্জন গুপ্তের পৈত্রিক বসন্তবাড়ি , মহিলা জমিদার রানী রাশমনির মকিমপুর কাচরিবাড়ি , দীঘি ও দোলমঞ্চ , কোটকোল সরকার বাড়ির, গােবিন্দ দেবের জোড়বাংলা মন্দির , প্রখ্যাত সুফি সাধক দেওয়ান শাহ ফয়জুল্লাহ ওরফে পজু দেওয়ানের মাজার , দরগাহ ও বিরাট দীঘি , ইতনা ও রাধানগরের মঠ , বৃটিশ বিরােধী আন্দোলনের নেস্তা নীমনি পােদ্দারের লােহাগড়াস্থ বাড়ি , শিবপত্নির পতিভক্তির উদ্দেশে নির্মিত শালনগরের চাকলানবীশ জমিদার বাড়ির শিবমন্দির , দোল মন্দির ও জোড়বাংলা মন্দির , ভুষণার রাজা সীতারাম রায়ের প্রধান সেনাপতি মৃন্ময় ঘােষ ওরফে মেনা হাতির বাড়ির শিব মন্দির ও জোড়বাংলা মন্দির অন্যতম ।
লােহাগড়া উপজেলার আরাে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে । তার মধ্যে ত্রয়ােদশ শতাব্দীর আধ্যাত্মিক শাসক গাজী - কালু চম্পাবতী খ্যান্ত গাজীর মােকামের ( স্থানটির বর্তমান নাম নলদী ) গাজীর দরগাহ , গােরস্থান ও ঈদগাহ , দেওয়ান শাহ ফয়জুল্লাহর নির্মিত পুরু ও মহিলাদের জন্য পাশাপাশি দু'টি পৃথক মসজিদ অন্যতম ।
প্রাচীন এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি নির্মাণে ব্যশ্বত ইট বা টালিগুলি পাতলা এবং সুদৃশ্য । চুন সুণ্ডকির সাহায্যে নির্মিত এসব ভবনের ইণ্ট ও টালিতে আজও নােনা ধরেনি । গাঁথুনিতে রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট । দগ্রজা , জানালা , ও খিলানে বিশেষ ধরনের কারুকাজ করা । দেওয়ালগুলি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক পুরু । মন্দির গাত্রের বিশেষ নকশা ছাড়াও ভনশীর্ষে বিভিন্ন প্রাণীর মূর্তি অথবা লস্তাপান্ত বা ফুলের নকশা । কোন কোন মন্দিরের ছাদে রয়েছে গম্বুজ যা মঠ সদৃশ্য ।
এসব প্রাচীন স্থাপনাগুলির অবশিষ্টাংশ এখনও সংরক্ষণ করা হলে তা দুমুল প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদে পরিণত হতে পারে । সৌভাগ্যের বিষয় গত কয়েক বছর পূর্বে ঔপন্যাসিক নিহার রঞ্জন গুপ্তের পৈত্রিক বাড়িটি প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসাবে ঘােষণা করে অধিগ্রহন করেছে এবং এখানে অসম্মাপ্ত কিছু নির্মাণ কাজও করা হয়েছে ।
লােহাগড়া উপজেলার কালনায় মুক্তিযােদ্ধাদের সাথে পাক আর্মিদের সম্মুখ যুদ্ধ স্থানটিও সংরক্ষণ করা হলে হতে পারে বিশেষ দর্শণীয় স্থান ।
উল্লেখ্য মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নড়াইল জেলার একমাত্র কালনায় পাক আর্মির সাথে মুক্তিযােদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ হয়েছিল । এ যুদ্ধে পাক আর্মি পরাজিত হয় এবং তাদের ৪ জন সৈনিক নিহত হয় । লােহাগড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মােল্যার মাঠটিও স্বনামে সংরক্ষণ করা হলে ঐতিহ্য সমুন্নত হবে ।
লেখক ও সম্পদনা(আবদুস ছালাম খান ( লেখক সিনিয়র আইনজীবী ও সাংবাদিক এবং সভাপতি লােহাগড়া প্রেসক্লাব )

0 মন্তব্যসমূহ