Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Responsive Advertisement

আনাড়ি হাতে গড়ে তোলা সাফল্য - দৈনিক রূপসাঞ্চল


আয়শা সিদ্দিকা:
পিছিয়ে থাকার সময় অনেক আগেই শেষ হয়েছে। অদম্য ইচ্ছা আর চেষ্টায় এগিয়ে যেতে হবে। যারা কঠিন পথ পাড়ি দিতে পেরেছেন, তারাই সফল হয়েছেন।তবে এ সফলতার পেছনে থাকে অক্লান্ত পরিশ্রম ও সুখ-দুঃখের হাজারো গল্প। তাদেরই একজন “ইয়োগাভাইভ” -এর স্বত্বাধিকারী রাবেয়া খাতুন অর্থি, একজন সফল যোগব্যায়ামের প্রশিক্ষক। তার সফলতার গল্প আপনাকেও অনুপ্রাণিত করবে।

নিজস্ব আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে একটু একটু করে গড়ে তুলেছেন ইয়োগাভাইভ, অর্জন করেছেন আস্থা। শুরুটা স্বাভাবিকভাবেই মসৃণ না হলেও মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে তাঁর এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তাকে বানিয়েছে একজন সফল উদ্যোক্তা। ইচ্ছা থাকলে কিই না হয় এটাই তার প্রমাণ। জানলে অবাক হবেন, স্নাতক সম্পন্ন করার আগেই কারো সাহায্য ছাড়া নিজের একক এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী রাবেয়া খাতুন অর্থি।ইয়োগা বা যোগব্যায়াম একটি শাস্ত্রীয় কৌশল, যা পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের মুনি ঋষিরা তাদের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা এবং দীর্ঘজীবনের জন্য বিভিন্ন কলা-কৌশল আবিষ্কার বা আয়ত্ত করেন। প্রায় ৪০০ বছর আগে সর্বপ্রথম ঋষি পতঞ্জলি কিছু আসনের কথা বলেন এবং এগুলো মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে ধীরে ধীরে এই কলাকৌশল ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর সর্বত্র। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর দিকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় ‘পতঞ্জলিআসনা’ নামে গ্রন্থটি ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে আরো অনেকেই যোগব্যায়াম এর ওপর বেশকিছু গ্রন্থ রচনা করেন।

ইয়োগা বা যোগব্যায়াম শুধু রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণই করে না; রোগ নিরাময়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভারত উপ-মহাদেশে এর উদ্ভাবন হলেও আজ সারা বিশ্বে ইয়োগা চর্চা বিকাশ ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রে দুই কোটি মানুষ ইয়োগা চর্চা করছেন। ইতিবাচক চিন্তা, প্রাণায়াম, নিউরোবিক জিম, মেডিটেশনের সমন্বয়ে ইয়োগার পরিপূর্ণ প্রয়োগ মানুষকে তার ভেতরের সুপ্ত অসীম শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারে। যোগব্যায়ামকে জীবনযাপনের অংশ করে তুলতে পারলে দেহ-মনের সুস্থতা ও শান্তি নিশ্চিত হবে।


নারীদের ব্যবসায়ীক ক্ষেত্রে এগিয়ে আসা ও সফলতা নিয়ে রাবেয়া খাতুন অর্থি বলেন, ‘ পড়াশোনা করতে করতেই দেখতাম আশেপাশের মানুষ আজকাল খুব অনলাইন বিজনেস করছে। আমারও ইচ্ছা হলো যে আমি কিছু করবো কিন্তু অন্য কিছু যা সবাই করে না। ভাবতে শুরু করলাম কি করা যায় এবং আমার ইন্টারেস্ট কিসে। ভেবে দেখলাম প্রাকৃতিক রূপচর্চা বা শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য খাবার নিয়ম ও ব্যায়াম বিষয়টা আমি বেশ ভালো বুঝি। এসব বিষয়ে কেউ কোনো সমস্যার কথা বললে তার সমাধান দিতে পারতাম যা তাদেরকে উপকৃতও করেছে। তাই ইয়োগা নিয়ে বড় কিছু করবো ভেবে এগোতে থাকলাম।’তিনি আরো বলেন, ‘ইয়োগা আমার অনেক ভালো লাগার জিনিস তাই ওটাই নিজের পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেছিলাম । কিন্তু এটার জন্য আগে চাই ভালো ট্রেনিং।তো আমি খোজ নিতে শুরু করলাম বাংলাদেশে কোথায় ভালো ইয়োগা ট্রেনিং নেওয়া যায়।এক সময় ইন্ডিয়ান হাই কমিশনের একজন গুরুজীর খোজ পেলাম, নাম শ্রী সত্যজীত বিশ্বাস এবং জানতে পারলাম বছরের কিছু সময় উনি ঢাকাতে কাটান এবং 'শ্রী পতঞ্জলি ইয়োগা সেন্টার' নামে একটি ইয়োগা ট্রেনিং সেন্টার পরিচালনা করেন। তার কাছ থেকেই ট্রেনিং নেবো ভেবে আমি সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল দিয়েই ঢাকা চলে যাই এবং শ্রী পতঞ্জলি ইয়োগ সেন্টারে ভর্তি হই। শুরু হয় আমার ট্রেনিং।দৈনিক ৫ ঘন্টা করে ক্লাস হতো। একদম ঠিক সময়ের মধ্যেই ট্রেনিং শেষ হয়ে গেলো।তারপর ফিরে আসলাম কিন্তু শুধু শিখে আসলেই তো হবেনা ওটাতো প্রাকটিসও করতে হবে। ভাবলাম একটা প্রতিষ্ঠান দিবো কিন্তু সেখানে মানুষ আসবে কিনা সেটাও ভাবনার বিষয়। তারপরও নিজে নিজে প্লান করলাম এটা যদি আমি করতে চাই তাহলে আমাকে প্রথমে কি কি করতে হবে এবং একটা লিস্ট বানিয়ে ফেললাম। প্রতিষ্ঠানের নাম এবং লোগোও মোটামোটি ঠিক করে ফেললাম।অবশেষে ২০১৬ সালের ১২ আগস্ট ছোট্ট একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু করলাম আমার প্রতিষ্ঠান।তখনো আমার তেমন স্টুডেন্ট ছিলোনা। একটু একটু মার্কেটিং শুরু করলাম। কোনোরকমে ২/৩ জন স্টুডেন্ট ম্যানেজ করে তাদের নিয়ে শুরু করলাম তারপর ধীরে ধীরে কয়েক মাসের মধ্যে বেশ ভালোই রেন্সপন্স আসতে শুরু করলো।ইতিমধ্যে ফেসবুকে পেজ তৈরী করলাম কিছু পাবলিক গ্রুপে পোস্টও দিলাম। তারপর ধীরে ধীরে কয়েক মাসের মধ্যে বেশ ভালোই রেন্সপন্স আসতে শুরু করলো।’

নারীদের ব্যবসায়ীক ক্ষেত্রে এগিয়ে আসা ও সফলতা নিয়ে তিনি বলেন, নারীরা যেসব ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে সর্বত্রই সফল হচ্ছে। তাই নারীদের সাহস করে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও যদি সমমর্যাদায় কাজ করে তবে দেশের চেহারা বদলে যাবে। বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নের মডেল রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃত হবে।বর্তমানে এখানে ৬ টি ব্যাচে ৮৬ জন শিক্ষার্থী ইয়োগা করছেন। খুলনার মতো ছোট্ট শহরে এই সংখ্যা একেবারে কম নয়। সকালের ব্যাচের শিক্ষার্থী উম্মে নাশিয়া বলেন, ‘২০২০ সালে আমার ওজন ছিল ৬৮ কেজি। শুধু ডায়েট করে আমি ওজন কমাতে পারছিলাম না। তারপর করোনাকালীন সময়ে ঘরে বসে না থেকে এখানে ভর্তি হলাম। ৬ মাসের মধ্যেই নিজের মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ্য করতে শুরু করলাম, এখন আমার ওজন ৫৫ কেজি। শুধু ওজনই নয়, আমি মানসিকভাবেও আগের থেকে এখন সুস্থ এবং স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’

শিক্ষার্থীদের দিক-নির্দেশনা দেওয়ার জন্য এখানে ৪ জন সহকারী প্রশিক্ষক রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন লায়লা নাজনীল। তিনি বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদেরকে প্রথমে মানসিকভাবে সুস্থ রাখার দিক নির্দেশনা দেই, পরবর্তীতে আমরা ফোকাস করি তাদের ফিটনেস এর ওপর। শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য আমরা মানুষের সুস্বাস্থ্যের ওপর সবার আগে গুরুত্ব দেই। ইতিবাচক চিন্তা এবং মেডিটেশনের সমন্বয়ে আমরা শিক্ষার্থীদের দেহ-মনের সুস্থতা ও শান্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করি।’

এখানে বর্তমানে ৬ জন গর্ভবতী মা ইয়োগা করছেন।গর্ভবতী মায়েদের, বিশেষ করে যারা প্রথমবার সন্তানের মা হবেন, তারা মর্নিং সিকনেসে বেশি ভুগে থাকেন। এসময় ঘন ঘন বমি পায়, সব কিছুতেই গন্ধ লাগে, খাবারে অরুচি ধরে যায়, শরীরে এনার্জি থাকে না। গর্ভাবস্থায় শরীরে যেসব পরিবর্তনগুলো আসে, তার সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে খুবই অস্বস্তি বোধ করেন। এই সময় যদি হাল্কা ব্যায়াম করা যায়, তা হলে এই সমস্যাগুলো কম হয়।যোগব্যায়াম স্বাভাবিক প্রসবের সম্ভাবনা বাড়ায় এবং প্রসবকালীন যন্ত্রণাও কম করে।খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা: ফরিদ-উজ-জামান বলেন, ‘মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য দরকার সঠিক ও সুষম খাবার। যেখানে আমরা কি খাচ্ছি, কি ভাবে নিশ্বাস নিচ্ছি, কি ধরনের চিন্তা করছি সেগুলি প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। শৈশবের ভিত্তিতে আমাদের মন, শরীর, আবেগ ও চিন্তার মধ্যে গভীর সংযোগ রয়েছে। শরীর ও মন দুইয়ের উপরেই যোগের প্রভাব অপরিসীম। যোগাসন মানসিক জড়তা ও অবসন্ন ভাব কাটাতে সাহায্য করে।ওজন কমানো, শক্তিশালী নমনীয় শরীর, উজ্জ্বল ত্বক, শান্ত মন, ভালো স্বাস্থ্য ইত্যাদি যা কিছু আমরা পেতে চাই সব কিছুর চাবি আছে যোগাসনে।’

অন্যান্য ব্যায়ামের সাথে এই ব্যায়ামের পার্থক্য কোথায়? এ বিষয়ে বলা যায়, ব্যায়ামের উদ্দেশ্য যদি হয় দেহে অসাধারণ পুষ্টি ও অমিত শক্তিধারণ, তবে তা ইয়োগা বা যোগ-ব্যায়াম দ্বারা সম্ভব নয়। আর যদি হয় ব্যায়ামের উদ্দেশ্য শরীরকে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম রাখা, দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখা এবং জ্বরা-বার্ধক্যকে দূরে রাখা, তাহলে এ ক্ষেত্রে ইয়োগার জুড়ি নেই। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বলতে যদি দেহের স্বাভাবিক গঠন, পুষ্টি ও শক্তিলাভ বোঝায়, এটা যোগ-ব্যায়াম দ্বারাই সম্ভব। সকাল-সন্ধ্যা যে কোনও সময় যোগাসন বা ইয়োগা করা সম্ভব। খাবার খাওয়ার ৩-৪ ঘণ্টা পরে, হালকা খাবারের পরে, চা বা এই জাতীয় পানীয়ের ৩০ মিনিট পরে এবং জল খাওয়ার ১০-১৫ মিনিট পরে আসন করলে উপকৃত হবেন।

যোগাভ্যাস একটি নিয়মিত অভ্যাস। দু একদিন করে ছেড়ে দিলে হবে না, নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমেই এর সুফল পাওয়া সম্ভব। নিজে নিজে অভ্যাস না করে একজন ট্রেনারের অধীনে এগুলো অভ্যাস করা ভালো। প্রয়োজন বুঝে ট্রেইনার নির্দেশ দিয়ে থাকেন ঠিক কোন ধরনের আসনগুলো করা উচিত। এর পাশাপাশি নানারকম রোগ যোগাসনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। যেমন- উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা, অ্যাজমা, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাইগ্রেন, দুশ্চিন্তা এবং অবসাদ ইত্যাদি। বিশেষ কয়েকটি যোগাসন (প্রাণায়াম, মেডিটেশন, রিউরোবিক জিম ও আকুপ্রেসার) নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমে এ ধরনের রোগগুলো থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যেতে পারে এবং অনেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কলস্টেরল ও অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ