আরবিএ:একদিন সুলতান মাহমুদ গজনিতে তার হাজার বৃক্ষের বাগানে গ্রীষ্মবাসের ছাদে বসে আল বিরুনিকে বললন, এ বাড়ির চার দরজার কোন দরজাটি দিয়ে আমি বের হবো, আপনি তা গুনে ঠিক করে একটি কাগজ়ে লিখে আমার কম্বলের নিচে রেখে দিন। আল-বিরুনি তার আস্তারলব যন্ত্রের সাহায্যে অঙ্ক কষে তার অভিমত একটি কাগজ়ে লিখে সুলতান মাহমুদের কম্বলের নিচে রেখে দিলেন। তখন সুলতান রাজমিস্ত্রির সাহায্যে একটি নতুন দরজা সৃষ্টি করে বেরিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসে দেখেন আল-বিরুনির কাগজে অনুরূপ কথাই লেখাঃ "আপনি পূর্ব দিকের দেয়াল কেটে একটি নতুন দরজা করে বেরিয়ে যাবেন"। কাগজের লেখা পাঠ করে সুলতান রেগে গিয়ে ছাদ থেকে আল-বিরুনিকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়ার জন্য আদেশ দিলেন। নিচে মশামাছি প্রতিরোধের জন্য জাল পাতা ছিল। সুলতানের আদেশ কার্যকর হওয়ার পর আল-বিরুনি সেই জালে আটকে গিয়ে মাটিতে আস্তে পড়ার ফলে বেশি আঘাত পেলেন না। সুলতান আল-বিরুনিকে আবার ডেকে আনলেন এবং তার চাকরের কাছ থেকে আল বিরুনির দৈনিক ভাগ্য গণনার ডায়েরিটা নিয়ে সুলতান দেখলেন, তাতে লিখা আছে "আমি আজ উঁচু জায়গা থেকে নিচে পড়ে গেলেও বিশেষ আঘাত পাব না"। এ দেখে সুলতান আরো রেগে গিয়ে আল-বিরুনিকে জেলে পাঠালেন। এরপর আল-বিরুনিকে কারগার থেকে মুক্তির সুপারিশ করতে কেউ সাহস পেলেন না। ছয় মাস পর সুলতানের মনমর্জি বুঝে প্রধানমন্ত্রী আহমদ হাসান একদিন আল-বিরুনির প্রতি সুলতানের নেক নজর আকর্ষণ করলেন। সুলতান মাহমুদের এ কথা স্বরণই ছিল না। তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে মুক্তি দিলেন।আবু রায়হান মোহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বিরুনির প্রতিভা বোঝার জন্য এই একটি ঘটনাই যথেষ্ট ।তিনি অত্যন্ত মৌলিক ও গভীর চিন্তাধারার অধিকারী ছিলেন।ভারতীয় পণ্ডিতরা তাকে বলতেন জ্ঞানের সমুদ্র,আর ইউরোপীয়দের মতে তিনি ছিলেন বিশ্বকোষ।তাঁর প্রত্যেকটি গ্রন্থ ছিল জ্ঞানে পরিপূর্ণ। আল বিরুনির সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ 'কানুনে মাসউদ'।এ সুবিশাল গ্রন্থটি সর্বমোট ১১ খণ্ডে সমাপ্ত। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গ্রন্থটিতে আলোচনা করা হয়। ১ম ও ২য় খণ্ডে আলোচনা করা হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে; ৩য় খণ্ডে ক্রিকোণমিতি; ৪র্থ খণ্ডে স্ফেরিক্যাল এস্ট্রোনমি; ৫ম খণ্ডে গ্রহ, দ্রাঘিমা, চন্দ্র সূর্যের মাপ; ৬ষ্ঠ খণ্ডে সূর্যের গতি; ৭ম খণ্ডে চন্দ্রের গতি; ৮ম খণ্ডে চন্দ্রের দৃশ্যমানতা ও গ্রহণ; ৯ম খণ্ডে স্থির নক্ষত্র; ১০ম খণ্ডে ৫টি গ্রহ নিয়ে এবং একাদশ খণ্ডে আলোচনা করা হয়েছে জ্যোতিষ বিজ্ঞান সম্পর্কে। এ অমূল্য গ্রন্থটি সুলতান মাসউদের নামে নামকরণ করায় সুলতান অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে আল বেরুনীকে বহু মূল্যবান রৌপ্য সামগ্রী উপহার দেন। কিন্তু সহজাত নির্লোভ এ মহান মনীষী উপহারে পুরো অর্থই রাজকোষে জমা দিয়ে দেন।এ মহামনিষীর জন্ম ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে খাওয়ারিজমের শহরতলিতে এক অতি সাধারণ ইরানি পরিবারে।বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য হতে প্রতীয়মান হয়, তার রচিত গ্রন্থের সর্বমোট সংখ্যা ১৮০টি। এগুলো তথ্য, তত্ত্ব ও পরিসরের দিকে হতে বিভিন্ন। কোনোটি পুস্তক, কোনোটি গবেষণামূলক আবার কোনোটি বৃহদাকার গ্রন্থ, যাতে জ্ঞানের বিশাল ভান্ডার বিধৃত ধারণ করা হয়েছে। তাঁর কাজগুলোর মধ্যে তরিকা আল হিন্দ, কিতাবুত তাহফিম(অংক, জ্যামিতি, বিশ্বের গঠন), ইফরাদুল ফাল ফিল আমরিল আযলাল, যিজে আবকন্দ(জ্যতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে), আলাল ফি যিজে খাওয়ারাজিমি(যুক্তিবিদ্যা সম্পর্কে) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।আল বিরুনির মাতৃভাষা ছিল খাওয়ারিজিম আঞ্চলিক ইরানি ভাষা। কিন্তু তিনি তার রচনাবলি আরবিতে লিখে গেছেন। আরবি ভাষায় তার অগাধ পান্ডিত্য ছিল। তিনি আরবিতে কিছু কবিতাও রচনা করেন। অবশ্য শেষের দিকে কিছু গ্রন্থ ফার্সিতে অথবা আরবি ও ফার্সি উভয় ভাষাতেই রচনা করেন। তিনি গ্রিক ভাষাও জানতেন। হিব্রু ও সিরীয় ভাষাতেও তার জ্ঞান ছিল।তিনি সর্বপ্রথম প্রাচ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান বিশেষ করে ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে একটি হলের নামকরণ করা হয়।অধ্যাপক মাপা বলেন, "আল-বেরুনি শুধু মুসলিম বিশ্বেরই নন, বরং তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীদের একজন।”যুগশ্রেষ্ট এ পণ্ডিত ১৩ই ডিসেম্বর ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে ৪৪০ হিজরি ২ রজব ৭৫ বছর বয়সে মারা যান।

0 মন্তব্যসমূহ