ঋতু দে
“বিশ্বে যা কিছু মহান ও চির কল্যানকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক নর “ বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের এই মহান উক্তিতে কোন দ্বিমত নেই। তবে জীবজগৎ বৈচিত্র্যময় তার বৈচিত্রতার শেষ নেই। আমাদের সমাজে নর-নারীর পাশাপাশি আরও এক ধরনের মানুষ বাস করে। তাদেরকে আমরা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করে থাকি করে থাকি। সমাজ তাদেরকে হিজরা বলে সম্মোধন করে থাকে।
হিজড়া সাধারণত তিনরকম: প্রকৃত হিজড়া ( True Hermaphrodite), অপ্রকৃত পুরুষ হিজড়া (Male Pseudo Hermaphrodite), এবং অপ্রকৃত নারী হিজড়া (Female Pseudo Hermaphrodite)। এছাড়া আরো এক ধরনের হিজড়া রয়েছে যাদেরকে কৃত্রিমভাবে হিজড়া বানানো হয়।জন্মের সময় একটি শিশু স্বাভাবিকভাবেই নারী বা পুরুষের বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে থাকে। তবে তৃতীয়লিঙ্গের শিশুরা যৌন ত্রুটি নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে থাকে।
একটি নির্দিষ্ট সময়ে গিয়ে শারীরিক পরিবর্তন প্রকট হয়ে ওঠে তখন তাদের হিজড়া বলে চিহ্নিত করা হয়। সমাজ পরিবার তাদেরকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে অসম্মতি প্রকাশ করে। রাস্তাঘাটে মানুষজন তাদের উদ্দেশ্যে বাজে বিভিন্ন মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়। সমাজ ও পরিবারের অবহেলায় তারা বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়। বেছে নেয় অনিশ্চিত জীবন।
সরকার ২০১৩ সালে হিজড়াদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের ভোটাধিকারও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও সমাজে তাদের অবস্থানের তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। সমাজে তারা প্রতিনিয়ত তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হয়। নিজ পরিবারেও তারা অচ্ছুত ও অনাদৃত। বাংলাদেশের উত্তরাধিকার আইন এখনো নারী-পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কারণে তারা সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে পারে না। বেশির ভাগ হিজড়াই কোনো সম্মানজনক জীবিকায় নেই, ভিক্ষা ও চাঁদাবাজিই তাদের মূল পেশা। কেউ কেউ আবার যৌনকর্মকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে।
দেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নিয়ে সঠিক কোনো তথ্যও নেই। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এদের সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। তবে এ সংখ্যা অনেক বেশি বলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিমত। সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বেশ কয়েকটি কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুলগামী হিজড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে চার স্তরে উপবৃত্তি প্রদান। ৫০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের অক্ষম ও অসচ্ছল হিজড়াদের বিশেষ ভাতা হিসেবে মাসিক ৬০০ টাকা প্রদান। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম হিজড়া জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। একটু সহযোগিতা পেলে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরাও সমানভাবে দেশ ও সমাজের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে ভূমিকা রাখতে পারেন। সমাজ থেকে এই বৈষম্য দূর করতে হলে আমাদের কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সকল জেন্ডারের মানুষের প্রতি আমাদের সমান দৃষ্টিভঙ্গি ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করতে হবে।সবাইকে সচেতন হতে হবে যেন লিঙ্গের মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব না নয়। পরিবার থেকে তৃতীয় লিঙ্গের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে।এটি কোন ধরনের অসুখ নয়।তারাও আমাদের মত সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন পালন করতে সক্ষম।বিদ্যালয়,কর্মক্ষেত্রেসহ সকলস্থানে তাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।আমরাই পারি তাদেরকে সমাজের মূলধারার ফিরিয়ে আনতে।আমরাই পারি নংপুসকদের জন্য একটি বৈষম্য মূলক মানবসমাজ উপহার দিতে।

0 মন্তব্যসমূহ